August 06, 2021

জীবনব্যাপী শিক্ষা বলতে কীবোঝ? জীবনব্যাপী শিক্ষার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখ। জীবনব্যাপী শিক্ষা প্রয়োজনীয়তা বা গুরুপ্ত লেখ।

 


 জীবনব্যাপী শিক্ষা বলতে কীবোঝ

খুব সহজভাবে বলতে গেলে জীবনব্যাপী শিক্ষা হল “যত দিন বাঁচি ততই শিখি”। জীবনব্যাপী শিক্ষা মনে করে শিক্ষা কেবলমাত্র বাল্যকাল থেকে বয়ঃসন্ধিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে পা চালিয়ে চলতে গেলে শিক্ষার ব্যাপ্তি হবে সমগ্রজীবনজন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

সুতরাং, ব্যাপক অর্থে—শিক্ষা সমাজবদ্ধ মানুষের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে সমব্যাপী একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক সকল সম্ভাবনার ক্রমবিকাশ যেমন পূর্ণতা লাভ করে তেমনি, ব্যক্তির সামাজিক সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে সমাজ সংরক্ষণ ও তার প্রগতিতে সাহায্য করার ক্ষমতা দান করে।

জীবনব্যাপী শিক্ষার বৈশিষ্ট্যাবলি

(1) ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল; এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এই শিক্ষা স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যক্তির প্রেষণার উপর নির্ভরশীল।

(2) লক্ষ্যভিত্তিকঃ- নির্দিষ্ট কোনা লক্ষ্য অর্জন যেমন কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন, পেশাগত দক্ষতা অর্জন, উচ্চতর শিক্ষার্জন ইত্যাদি এই শিক্ষায় প্রেষণা সঞ্চার করে।

(3) শিক্ষার সময়কাল নির্দিষ্ট নয়;- এই শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সময় থেকে ব্যক্তি শিক্ষা গ্রহণে সমর্থ সেই সময় থেকে আমৃত্যু তিনি শিক্ষা অর্জন করতে পারেন।

(4) নির্দিষ্ট কোন পাঠক্রম নেই:- নির্দিষ্ট এবং বাঁধাধরা কোনাে পাঠক্রম নেই। কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে পাঠক্রম থাকলেও তা যথেষ্ট নমনীয় হয়।

(5) ব্যক্তির স্বাধীনতা:- এখানে ব্যক্তি শিক্ষার্থী যথেষ্ট স্বাধীন, যে তার ইচ্ছা, সামর্থ্য এবং প্রয়ােজন অনুযায়ী শেখার স্বাধীনতা পায়।

(6) নমনীয় মূল্যায়ন:- কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলেও তা যথেষ্ট নমনীয় হয়।

(7) জীবনব্যাপী শিক্ষার কোর্স: প্রথাগত শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সের বিষয়বস্তুকে জীবনব্যাপী শিক্ষার উপযােগী করে জীবনব্যাপী শিক্ষার কোর্স রচনা করা হয়। এছাড়া বৃত্তি শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সও অন্তর্ভুক্ত হয়।

(৪) প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : দূর শিক্ষা ও মুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শিক্ষা সংস্থার সঙ্গে জীবনব্যাপী শিক্ষার নেটওয়ার্কে সংযােগ থাকবে।

জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুপ্ত

শিক্ষার ব্যাপ্তি সমগ্র জীবনব্যাপী হওয়ার পশ্চাতে পাঁচটি প্রয়ােজনীয়তার কথা উল্লেখ করা যায়।

(1) পরিবর্তন: আমাদের জীবন পরিবর্তনশীল। বর্তমান বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে এই পরিবর্তন দ্রুত এবং ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। পরিবর্তনশীল জীবন ও জগতের সঙ্গে সার্থক অভিযােজনের (যা শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য) জন্য প্রবাহমান বা নিরবচ্ছিন্ন শিখনের প্রয়ােজন যা জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।

(2) বৃত্তিজগতের পরিবর্তন: প্রযুক্তির উন্নতি, নতুন দ্রব্যের উৎপাদন ও উৎপাদনের কৌশল এবং নতুন জ্ঞান সম্মিলিতভাবে বৃত্তি জগতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কয়েক দশক পূর্বে যে ধরনের বৃত্তির প্রয়ােজন ছিল। বর্তমানে তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বর্তমান বৃত্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রকৃতির শিক্ষার প্রয়ােজন যা জীবনব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে অর্জন করা সম্ভব।

(3) সামাজিক পরিবর্তন: গণমাধ্যম যেমন দূরদর্শন, ইন্টারনেট, কমপ্যাক্ট ডিস্ক ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে সামাজিকীকরণের সংস্থা হিসেবে পরিবারের ভূমিকা ক্রমশ ক্ষীয়মান। দ্রুত নগরায়নের ফলে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং নারী-পুরুষের ভূমিকা পরিবর্তনের ফলে মূল্যবােধের পরিবর্তন হচ্ছে। এইভাবে দ্রুত সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়ােজন।

(4) সমাজের দুর্বল জনগণ: সমাজের দুর্বল জনগণের শিক্ষার চাহিদা প্রধানত শিক্ষার দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া এদের মধ্যে একটা বড়াে অংশ বিভিন্ন কারণে প্রারম্ভিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হবার পূর্বেই পাঠত্যাগ করে। এদের মধ্যে কেউ যদি পরবর্তী সময়ে শিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক হন, সেক্ষেত্রে জীবনব্যাপী শিক্ষা সাহায্য করতে পারে।

(5) জনসংখ্যার চরিত্রের পরিবর্তন: জীবনের মান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে প্রতি দশকেই বৃদ্ধদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতবর্ষে অধিকাংশ চাকুরিজীবীরা 58 থেকে 60 বছরে অবসর গ্রহণ করেন যদি তারা উৎপাদনক্ষম। তাদের কর্মক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের গঠনমূলক কাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যার জন্য প্রয়ােজন হল উপযুক্ত শিক্ষা। জীবনব্যাপী শিক্ষা এক্ষেত্রে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জীবনব্যাপী শিক্ষা প্রয়োজন শুধু তাই নয়, এটি অপরিহার্য।


Download Pdf